টুকুনগল্প

ম্লান মনোরম মনোটোনাস শহর

কেউ নেই বাসায় আজ। আব্বা আম্মা চট্টগ্রাম গেছে দাদার কবর জিয়ারত করতে। আনিকা আজ বান্ধবীর বাসায় থাকবে। আমার কাছে ছোটবোনকে রেখে যেতে আম্মা শান্তি পায় না। মাস তিনেক আগে কি যেন করতে গিয়ে আমার টেবিলের ড্রয়ার থেকে কিছু বাজে সিডি পেয়েছিল আম্মা। আমি শুয়ে মাহমুদুল হকের ‘জীবন আমার বোন’ পড়ছিলাম। হঠাৎ এসে সব সিডি আমার মুখে ছুঁড়ে মারলো। আম্মার মুখে বাজে এক দুটো গাল আগে শুনেছি। এতো গাল আম্মা জানে জানতাম না। এরপর অনেক দিন আমার সাথে কথা বলে নি। আমি কেমনে তাকে বুঝাই আসলে এগুলা কিছু না। এই বয়েসে সবাই এসব করে। আজ যাবার সময় বলে গেল- একা থাকবা যা ইচ্ছা কইরো। আব্বা অবাক হয়ে গেছিল এ কথা শুনে। কি বলো এসব- যা ইচ্ছা করো। ছেলের সাথে এভাবে কথা বলো কেন? আম্মা কথা না বাড়িয়ে লিফটে ঢুকে গেল।

আমাদের বাসা ইন্দিরা রোডের শেষ মাথায়। মানিক মিয়া এভিন্যুর উল্টোদিকে। ষোলতলা বিল্ডিং। আমরা থাকি পনের তলায়। উপর থেকে ঢাকা শহরকে দেখলে এত কদর্য লাগে না। আমি লিখি। মানে ব্লগার আর কি। বাসায় কেউ জানে না। ছদ্মনামে ব্লগ পোস্ট করি। উড়োখই নাম। নানান ভারসাম্যহীন ব্লগ পোস্ট করে দিই। এমন বিষয়ের উপর লিখি যার বিন্দুবিসর্গ জানি না। এদিক ওদিক ঘেঁটে মেটে লিখে ফেলি। জ্ঞানের কালোয়াতি চর্চার মজা ব্যাপক। উড়াধুড়া টপিকের অভাব নেই এই ব্লগজগতে। জাতির চেহারা বনাম জাতির স্বরূপ আকা জাতীয়তাবাদ-উহু-আহা। ইভটিজীং বনাম নারীর মনোজগৎ কি পুরুষের অপর। গণতন্ত্র অথবা গণস্বৈরতন্ত্র বনাম স্বৈরতন্ত্র । ছাগুভক্ষণজীবি বিপরীতে পাতাজীবি। কথার তোড়ে কথা চাপা পড়ে। মাঝে মাঝে ভাবি আমার কথা আমি নিজে কতটুকু বিশ্বাস করি! কাল এক ব্লগে একজনের কমেন্ট পড়ে বেদম হাসি পেয়েছিল। আম্মা লাফিয়ে রুমে ঢুকবে বলে গিলে গিলে হাসলাম। একজন লিখেছে- হাগার পরাণ আছে। হাগলে হাগা ব্যথা পায়।

আগে মডুবাবাদের দিকে পিত্যেশ করে থাকতাম। আমি আপ করে দিতাম। ওয়েট করতাম কখন উনারা আপ করেন। এখন নিজেই আপ করতে পারি ছাই পাশ সব।তবে ব্লগের টান কমে গেছে। দুই তিন দিনে একবার হয়তো ঢুঁ মারি। অন্যদের লেখা না পড়ে অনেকসময় কেবল মন্তব্য পড়ে লিখে দিই দু চার কথা। ভাল্লাইছে। চ্রম। হ। র। ক। ল। প্রথম প্রথম নিজের ছাপানো লেখায় রিফ্রেশ মেরে মেরে দেখতাম কি কমেন্ট আসছে।কমেন্টে কেউ ভাব নিলে আমি পাঠ নিতাম। এখন লেখা আপ করে দুইদিন পরে ঢুকি। এক দুইটায় কমেন্টের জবাব দেই। এই ভার্চুয়ালে আবার দু চারজনের মধ্যে বড় মানুষের ছায়াও দেখি।কারো কারো লেখায় রক্তবেগতরঙ্গিত হই।

নিজের একান্ত এই বিকেলসন্ধ্যায় বারান্দায় যাই। হাতছোঁয়া আকাশের আলো ফিকে হয়ে গেছে। বাড়ির মধ্যের আলো আলো খেলা বিবর্ণ ভোঁতা লাগে। গাছ। তার পাতা তার শরীরকে ধূসর বলে মনে হয়। হলদে হ্যালোজেনে নগরীর গাড়িগুলো সাঁতার কেটে বেড়ায়। পিঁপড়ে মানুষগুলা সারি বেধেঁ অনর্থক হেঁটে চলে । এক ফালি চাঁদ আলো দিতে না পেরে কুঁচকে এতটুকুন হয়ে আসে। বাতাস উবু হয়ে আমায় ছুঁতে গিয়ে ফসকে দূরে সরে যায়। হাতের সিগারেট একা একা জ্বলে ছাই ভস্ম হয়।

এই ম্লান মনোরম মনোটোনাস শহরে আমার কিছু করার নেই। আমার কথার বমি চুপে ব্লগে আপ করে শুয়ে পড়ি। বাতি নিভিয়ে।


ফিরেঃ আখতারুজ্জামান ইলিয়াছের অন্য ঘরে অন্য স্বর গল্পগ্রন্থের প্রথম গল্প নিরুদ্দেশ যাত্রা শুরু হয়েছিল এভাবে- এই মনোরম মনোটোনাস শহরে অনেকদিন পর আজ সুন্দর বৃষ্টি হলো।